• header_en
  • header_bn

TIB recommends 16 measures for governance of Private Universities (Bangla)

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় খাতে সুশাসন নিশ্চিত করণে টিআইবি’র ১৬ দফা সুপারিশ
ঢাকা, ৩০ জুন: অলাভজনক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতামূলক দুর্নীতির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভজনক পণ্যে রূপান্তরিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান বিবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে অনতিবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর পরিচালিত “বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়”শীর্ষক এক গবেষণা প্রকাশ করে টিআইবি জানায় ১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশের ৭৯টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা সকল সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ব্যয়বহুল হলেও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের কারণে কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিক হাসান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নীনা শামসুন নাহার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের।
২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত নির্বাচিত মোট ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রণীত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ইতিবাচক দিকের মধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বিদেশগামীতার বিকল্প হিসেবে ভূমিকা পালন, কর্মজীবিদের জন্য অব্যাহত শিক্ষার সুযোগ, নারীদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দরিদ্র মেধাবী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বৃত্তির সুযোগ অন্যতম।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকারের সুষ্ঠু ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব, ২০১০ এর আইন অনুযায়ী একটি জাতীয়, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন এ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ৪ বছরেও গঠন না করা, অলাভজনক খাতসত্ত্বেও ক্রমাগত মুনাফাভিত্তিক হয়ে ওঠা, অব্যাহত রাজনৈতিক প্রভাব সর্বোপরি শিক্ষার নামে বাণিজ্যসহ ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সুনির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। এছাড়া বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার বিধিমালা ২০১৪ প্রবর্তনের ফলে নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানা সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের মধ্যে রয়েছে জনবলের অভাব, উচ্চ পর্যায়ের চাপ ও মামলা সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনুনোমোদিত ও আইন ভঙ্গকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করাসহ শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা ও সনদ বাতিল করতে না পারা, বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব, অনুমোদনে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেন, মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগসাজসে ইউজিসি কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগ অদৃশ্য উপায়ে মীমাংসা হওয়া, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদান না করে বার বার আলটিমেটাম দিয়ে দায়িত্ব সম্পন্ন করা উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৩ কোটি টাকা, ভুয়া সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ টাকা এবং অডিট প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা প্রদানের মত আর্থিক দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে এই গবেষণায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অর্থ কমিটিসহ অন্যান্য কমিটির দায়িত্ব ও কার্যক্রম ট্রাস্ট্রি বোর্ডের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে নিজস্ব অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার, ইউজিসিকে না জানিয়ে সাধারণ তহবিলের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ ও আত্মসাৎ, শিক্ষকদের পারফরমেন্স মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার, কম যোগ্য ব্যক্তিকে বিভাগীয় প্রধান করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের কোন কোন সদস্য। এছাড়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে স্থায়ী সনদ গ্রহণ করার নিয়ম থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শর্ত পূরণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে স্থায়ী সনদ গ্রহণ করেছে। ৭৯ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৭টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িক অনুমতি নিয়ে তা বার বার নবায়নের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া কোর্স কারিকুলাম পড়ানো; বিভাগ খোলা ও শিক্ষার্থী ভর্তি এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অনুমোদন; ক্লাস না করিয়ে, পরীক্ষা না নিয়ে ও ব্যবহারিক ক্লাস (বিশেষায়িত ল্যাব সুবিধা অপর্যাপ্ত) না নিয়ে টাকার বিনিময়ে সার্টিফকেট প্রদান; কাগজে কলমে শিক্ষকের কোটা পূরণ দেখালেও বাস্তবে শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকা; গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখার নিয়ম থাকলেও তা ব্যয় না করা; মাস্টার্সের থিসিস, জার্নালে লেখা ও ব্যক্তি উদ্যোগের কাজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলে চালানো; সমঝোতার মাধ্যমে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র গোপন করার মত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান রয়েছে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ইউজিসির নির্দেশনা অনুসারে ২টির বেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা নিষিদ্ধ থাকলেও তা না মেনে অধিকসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পৃক্ত থাকাসহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উপঢৌকন গ্রহণ করে পাশ করিয়ে দেওয়া, পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্ন বলে দেয়া ও সে অনুসারে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির মতো অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত কিছু শিক্ষকবৃন্দ। অন্যদিকে শিক্ষার্থীগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামূল্য ও সার্টিফিকেট মূল্য নেই জেনেও ভর্তি হওয়াসহ সার্টিফিকেট ক্রয়, ভূয়া সার্টিফিকেটের ব্যবহার, শিক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া বা পাশ করানোর জন্য চাপ প্রয়োগের মতো অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তদারকি ও সমন্বয়হীনতার ফলে এবং ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের কারণে দুর্নীতির উদ্ভব ও প্রসার হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাত হুমকীর সম্মুখীন হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে এই খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার অন্য কোন বিকল্প নেই।”
সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুশাসনের সার্বিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণে ১৬ দফা সুপারিশ উত্থাপিত হয়। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সুপারিশ সমূহের মধ্যে রয়েছে- বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী এবং পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রণয়ন; অবিলম্বে এ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন; ইউজিসির জনবল, সক্ষমতা ও এখতিয়ার বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালিকরণ; আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত শাস্তিমূলকব্যবস্থা গ্রহণ;শুধুমাত্র উচ্চ রেটিং প্রাপ্ত বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্ধাারিত শর্ত মেনে শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা; বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্টির একচ্ছত্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ; ভিসি, প্রো-ভিসি এবং অন্যান্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব দূর; প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে একাডেমিক কাউন্সিলের মূল ভূমিকার বিষয়টি নিশ্চিত করা, অডিট প্রতিবেদনসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সকল ধরনের তথ্য উন্মুক্ত করা; পূর্ণ এবং খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

Media Contact