• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

Curb influence of MPs and ensure even distribution of power among public representatives and administration (Bangla)

স্থানীয় সরকার খাত: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়
সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা পরিহার করে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার সুষম বন্টনের ওপর গুরুত্বারোপ
২৫ মে, ঢাকা ২০১৪: আজ এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা স্থানীয় সরকার খাতের সুশাসন নিশ্চিতকরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকান্ডে সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পরিহারসহ প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বন্টনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে “স্থানীয় সরকার খাত: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনের প্রকাশ উপলক্ষে টিআইবি কর্তৃক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তারা এ মতামত ব্যক্ত করেন। গবেষণা প্রতিবেদন যৌথভাবে উপস্থাপ করেন ফারহানা রহমান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও মো. রবিউল ইসলাম, অ্যাসিসট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগ, টিআইবি। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মশিউর রহমান রাঙ্গা, এমপি। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জারিনা রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান এবং স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
আলোচ্য গবেষণায় সংশ্লিষ্ট আইনের পর্যালোচনাসহ স্থানীয় সরকার খাতের আর্থিক বরাদ্দ, জনবল ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রমের তদারকি, নিরীক্ষা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, প্রতিষ্ঠানসমূহের আন্তঃসম্পর্ক, তথ্যের উন্মুক্ততা, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ব্যবহার ও ক্রয় প্রক্রিয়া, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম/ প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়, সেবামূলক কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের বিষয়সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০০৯-২০১২ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার খাতের বেশ কিছু ইতিবাচক অর্জনের কথা তুলে ধরে বলা হয় এই সময়ে সর্বমোট ৫,৪৩৯টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ৫,৩৭৩টিতে (৯৮.৭৮%) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি; ২১,৩১০ কিমি কাঁচা/পাকা সড়ক, ,৮২২ মিটার ব্রিজ/ কালভার্ট নির্মাণ, ৭৯১টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ও ১,৩২৭টি গ্রোথ সেন্টার নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সমাপ্ত হয়। একই সময়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ৯৮,২৪০ জন দুস্থ নারীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি; সংগঠনের মাধ্যমে প্রায় ৯০,০০০ পরিবারকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান; আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন; ৪১,৩৭০ জন জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এছাড়ও ১৩৩টি পৌরসভায় ডিজিটাল মাস্টার প্ল্যান, কর ব্যবস্থাপনা, ট্রেড লাইসেন্স হিসাব পদ্ধতি, পানির বিল ইত্যাদি বিষয়ে সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ; ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপন ও ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার সরঞ্জাম সরবরাহ; জিআইএস ম্যাপিং, পরিসংখ্যাপত্র এবং উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার; এবং অন-লাইন জন্ম নিবন্ধনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।
গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের যেকোনো কাজের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের আইনে সংসদ সদস্যদের পরিষদের উপদেষ্টা করে তাদের পরামর্শ গ্রহণের বিধানের মাধ্যমে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত জনবলের পদের বিপরীতে পৌরসভায় প্রায় ৪০% এবং জেলা পরিষদে প্রায় ২০% শূন্য রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষমতার প্রভাব, ঘুষ ইত্যাদি অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বাজেট কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল, তবে তা প্রতিষ্ঠান ভেদে ভিন্ন। আবার বরাদ্দকৃত অর্থের শেষ কিস্তি দেরিতে ছাড় করার ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। বিভিন্ন প্রকল্প ও বিশেষ বরাদ্দ পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হয় এবং প্রকল্প ভেদে ঘুষের এই হার বরাদ্দের ১% থেকে ১০% হয়ে থাকে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের ঘুষ আদায় ও উপঢৌকন দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা গবেষণায় উদঘাটিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছানুযায়ী নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নিরীক্ষা কর্মকর্তাকে ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং পৌরসভার পক্ষ থেকে ৪০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়।
প্রতিবেদনে টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপ ২০১২ এর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব, প্রত্যয়নপত্র ইত্যাদি) সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৩৫.% খানা বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের শিকার হয়। এসকল সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে খানাগুলোকে গড়ে ৯৪ টাকা নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দিতে হয়েছে। একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত খানাগুলোর ৩৫.% বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়, যার মধ্যে ৫০.% খানাকে গড়ে ১,০৪৮ টাকা নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের মাধ্যমে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। কেউ মারা গেলে কাউন্সিলররা সেই সদস্যের খানার কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে কার্ড গ্রহীতাকে অসুস্থ লিখে দেয় ও মৃত ব্যক্তির খানার অন্য সদস্য টাকা উত্তোলন করে।
এছাড়া টিআর ও কাবিখার বরাদ্দ এবং বিলের টাকা ছাড় করতে পিআইও’কে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দিতে হয়। পণ্য ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত দরপত্র এবং কোটেশন পদ্ধতিতে কাজ পেতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি মেয়র/চেয়ারম্যান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে প্রাপ্ত কাজের মূল্যের ১০-১৫% ঘুষ দিতে হয়। একইভাবে কাজের বিল প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হয়। যেসব খানার সদস্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে বিচার ও সালিশ সংক্রান্ত সেবা নিয়েছিল, তার ৩৪.% খানার সদস্য জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জনাব মশিউর রহমান রাঙ্গা, এমপি বলেন, “বর্তমান সরকার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি জনমুখী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি আইন ও বিধি সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো নিয়ে আরো গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া দরকার। গবেষণার মতামত ও সুপারিশমালা বাস্তবায়নে আমার মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে।”
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, “জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে জনগণের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।”
. তোফায়েল আহমেদ স্থানীয় সরকার খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ত্রান ও পুর্নবাসন, সমাজসেবা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কার্যক্রমকেও বিবেচনায় আনার আহ্বান জানান। অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, “এডিবিতে উপজেলা ভিত্তিক ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো গেলে স্থানীয় সরকার খাতে উন্নয়নে গুনগত মান বজায় রাখা সম্ভব হবে। অধ্যাপক জারিনা রহমান খান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থায়ী কমিটিগুলোতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার খাতের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৮ দফা সুপারিশ উত্থাপন করে এ খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণে সরকারের যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করা হয়। উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হল:- সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে ক্ষমতা প্রদান করা; প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বণ্টন করা; যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া; সরকারি বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের শ্রেণির পাশাপাশি জনসংখ্যা, আয়তন এবং প্রয়োজন বিবেচনা করা; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাল  কাজের জন্য প্রণোদনা এবং দুর্নীতির জন্য তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে বাজেট প্রকাশ করে তাতে জনমতের প্রতিফলন ঘটানো; -প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে চালু এবং কর ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা; এবং সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও অধিদপ্তরে নাগরিক সনদ প্রদর্শন করা এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা। এছাড়াও নাগরিক সনদে অবশ্যই প্রযোজ্য সকল সেবার ফি উল্লেখ করার প্রস্তাব করা হয়।

Media Contact