• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

TIB's parliament watch report on the ninth parliament - The main opposition sets new record of boycotting sessions (Bangladesh)

পার্লামেন্ট ওয়াচ প্রতিবেদন প্রকাশ
প্রধান বিরোধীদলের সংসদ বর্জনের নতুন রেকর্ড, আইন করে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি প্রতিরোধের আহ্বান টিআইবি’র
ঢাকা ১৮ মার্চ ২০১৪: নবম জাতীয় সংসদের জানুয়ারি ২০০৯ থেকে নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত মোট ১৯টি অধিবেশনের সর্বমোট ৪১৮ দিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধীদল ৩৪২ কার্যদিবস বা প্রায় ৮২ শতাংশ সময় সংসদ বর্জন করার পটভূমিতে টিআইবি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দলীয় বা জোটগতভাবে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে। আজ নবম জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর টিআইবি’র পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা প্রতিবেদন ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম. হাফিজউদ্দিন খান, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান।
প্রতিবেদনে জানানো হয় ‘প্রধান বিরোধী দলের নেতা মাত্র ২.৩৯% সময় উপস্থিতির মাধ্যেমে সর্বনিম্ন উপস্থিতির নতুন রেকর্ড স্থাপন করেন। নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল অধিকাংশ সময় কার্যদিবস সংসদ বর্জন করায় সংসদ বর্জনের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খান বলেন, "শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে জাতীয় সংসদ কার্যকর হচ্ছে না। সংসদকে কার্যকর করতে হলে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের কোন বিকল্প নেই। সংসদ সদস্যদের নিয়মিত উপস্থিতি ও সংসদকে সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করার মাধ্যমেই দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।”
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "সংসদ বর্জনের এই সংস্কৃতি সংসদীয় গণতান্ত্রিক চর্চায় বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়, যা একদিকে যেমন বিব্রতকর, অন্যদিকে তেমনি জনগণের ভোট ও রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার পরিচায়ক।” তিনি সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির সর্বোচ্চ সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস করার সুপারিশ করেন।
প্রতিবেদনে নবম জাতীয় সংসদের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা, সংসদীয় কার্যক্রমে সংসদ সদস্য ও সংসদীয় কমিটির ভূমিকা, আইন প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ, সংসদীয় কার্যক্রমে নারী সদস্যদের ভূমিকা বিশ্লেষিত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে কার্যদিবস, কোরাম সংকট এবং সদস্যদের উপস্থিতি, অধিবেশন বর্জন, ওয়াক আউট, স্পিকারের ভূমিকা, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, বাজেট আলোচনা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, জন-গুরুত্বসম্পন্ন নোটিস সংক্রান্ত বিষয়, আইন প্রণয়ন, পয়েন্ট অব অর্ডার, বিভিন্ন বিধিতে মন্ত্রীদের বক্তব্য, সংসদীয় কমিটি সংক্রান্ত মৌলিক তথ্য, সাধারণ আলোচনা এবং সদস্যদের সংসদীয় আচরণ বিষয়ক পর্যবেক্ষণ সন্নিবেশিত হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী নবম সংসদে বিভিন্ন ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে সদস্যদের গড় উপস্থিতির হার অষ্টম সংসদের তুলনায় ৬৩% এ বৃদ্ধি পাওয়া, অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার সুযোগ হ্রাস পাওয়া, প্রথম অধিবেশনেই সকল সংসদীয় কমিটি গঠিত হওয়া সহ চারটি কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করা, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে নিয়মিত অংশগ্রহণ, অধিবেশনে বিলের ওপর সংশোধনী, যাচাই-বাছাই প্রস্তাব-এর ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তীতে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের ক্রমাগত অনুপস্থিতির কারণে এইসব ইতিবাচক অর্জন ধরে রাখা যায়নি। যেমন অনুপস্থিতির কারণে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের দেওয়া প্রস্তাবসমূহ সংসদে উত্থাপিত-ই হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় জন-প্রত্যাশার কেন্দ্রস্থল মহান জাতীয় সংসদের কার্যকরতার পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত রয়েছে। কোরাম সংকটের কারণে গড়ে ৩৬ মিনিট হিসেবে ২২২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট অপচয়িত হয়। সংসদ অধিবেশন পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় প্রায় ৭৮ হাজার টাকা হিসাবে প্রতি কার্যদিবসের গড় কোরাম সংকটের সময়ের অর্থমূল্য প্রায় ২৪ লক্ষ ৯৬ হাজার টাকা এবং সংসদের পূর্ণ-মেয়াদে কোরাম সংকটের মোট অর্থমূল্য প্রায় ১০৪ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭ ভাগে দাঁড়িয়েছে যা প্রথম সংসদে ছিল মাত্র ১৭.৫ ভাগ, পক্ষান্তরে প্রথম সংসদে আইনজীবীদের শতকরা হার বেশি থাকলেও ক্রমাগত তা হ্রাস পেয়ে নবম সংসদে ১৪ শতাংশে পৌঁছায়। নবম সংসদে ১৯টি অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যয়িত মোট সময় ছিল ১৩৩১ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট। প্রতি কার্যদিবসে গড় বৈঠক-কাল ছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট। ২১.% সময় বাজেট আলোচনায়, ১৮.% সময় প্রতিনিধিত্ব ও তদারকি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মধ্যে মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এবং মাত্র ৮.% সময় আইন প্রণয়নে ব্যয়িত হয়।
"পার্লামেন্ট ওয়াচ" প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি দলের সংসদ সদস্যের মধ্যে শতকরা ৪৬.৯ ভাগ সদস্য অধিবেশনের তিন-চতুর্থাংশের বেশি অর্থাৎ মোট কার্যদিবসের ৭৫ শতাংশের বেশি কার্যদিবসে সংসদে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের সকলেই ১৯টি অধিবেশনের মোট কার্যদিবসের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২৫ শতাংশ বা তার কম কার্যদিবস উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের ক্ষেত্রে পঞ্চম সংসদে এই হার ছিল প্রায় ৩৪%, অষ্টম সংসদে তা বেড়ে হয় ৬০% এবং নবম সংসদের তা পূর্বের সকল রেকর্ডকে অতিক্রম করে ৮২%-এ দাঁড়ায়।
এই সময়কালে মোট ২৭১টি বিল পাস করা হয় যার ২৬৮টি সরকারি বিল এবং ৩টি বেসরকারি বিল। তবে সংসদ সদস্য কর্তৃক বিলের উপর জনমত যাচাইয়ের বাছাইয়ের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পূর্বেকার চর্চা অব্যাহত ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী সংসদের মোট সময়ের ৮.% সময় আইন প্রণয়নে ব্যয়িত হয়েছে এবং একটি বিল পাশের ক্ষেত্রে গড়ে মাত্র ১২ মিনিট সময় ব্যয়িত হয়েছে। আলোচ্য ১৯ টি অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য কিছু বিল যেমন- ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০১১; তথ্য অধিকার বিল, ২০০৯; জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) বিল, ২০১০; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিল, ২০০৯ এবং ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) বিল, ২০১৩; আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী দ্রুত বিচার (সংশোধন) বিল, ২০১০; স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) বিল, ২০১১’ এবং ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০১১ পাশ করা হয়। তবে সংসদ সদস্যদের আচরণ বিধি বিল, ২০১০ পাসের জন্য স্থায়ী কমিটি কর্তৃক ২০১১ সালের ২৪ মার্চ সুপারিশ করা হলেও নবম সংসদ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত পাশ হওয়ার জন্য উত্থাপনের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকলেও এ বিষয়ে কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
নবম সংসদে ৫৩টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও ১৮৩টি উপকমিটি গঠন করা হয়। ৪৫টি কমিটি মোট ১০১টি প্রতিবেদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২২টি কমিটির ৪৯৩৫টি সুপারিশের বিপরীতে মোট ১৭৮৭টি (৪৩.১৭%) সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে। ২৩টি কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সুপারিশ বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৬৪% (অষ্টম সংসদে-প্রায় ৫৫%)। এছাড়া ২০টিরও অধিক কমিটির (যেমন নৌপরিবহন, যোগাযোগ, বস্ত্র ও পাট, বাণিজ্য) সদস্যদের বিরুদ্ধে কমিটির সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতি সম্পর্কিত তদন্তের ক্ষেত্রে বিমানের দুর্নীতি, পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য খসড়া কৌশলপত্র প্রণয়ন, পূর্ববর্তী স্পিকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি, বিআরটিএ’র অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ় করা, সংসদের কার্যকর করা ও সর্বোপরি সংসদকে জবাবদিহিতার কেন্দ্রবিন্দু করতে সদস্যদের উপস্থিতি, তাদের গণতান্ত্রিক আচরণ ও অংগ্রহণ, সংসদের কার্যদিবস ও কার্যসময়, তথ্য প্রকাশ, সংসদীয় কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সংসদীয় কমিটির কার্যকরতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত ২১ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশসমূহ হল: সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি প্রতিহত করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করে দলীয় বা জোটগতভাবে সংসদ বর্জন নিষিদ্ধকরণ, এক্ষেত্রে দলীয়ভাবে সদস্যপদ বাতিলের বিধান প্রণয়ন; সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকার সর্বোচ্চ সময়সীমা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে উদাহরণ স্বরূপ ৩০ কার্যদিবস করার বিধান করা সহ অনুমোদিত ছুটি ব্যতীত একটানা সাতদিনের বেশি অনুপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ করা; সংসদ সদস্য আচরণবিধি বিল ২০১০ চূড়ান্ত অনুমোদন ও আইন হিসেবে প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। এছাড়াও আন্তর্জাতিক চুক্তিসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ে সংসদে আলোচনা করার বিধান কার্যকর করা; অধিবেশনের কার্যদিবস বছরে কমপক্ষে ১৩০ দিন নির্ধারণ করা; সংসদ অধিবেশন ও স্থায়ী কমিটির সভায় সদস্যদের উপস্থিতিসহ সংসদ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে ও সময়মত ওয়েবসাইটে প্রকাশ; জনগুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বা জনমত যাচাই; সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয়ে গণভোটের আয়োজন; সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য/আপত্তি লিখিতভাবে জানাবে সুপারিশের আলোকে মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা ৬০ দিনের মধ্যে বাধ্যতামূলক ভাবে লিখিতভাবে জানানোর সুপারিশ করা হয় পার্লামেন্ট ওয়াচ প্রতিবেদনে।
Media Contact