• header_en
  • header_bn

TIB's recommendation for improving the planning & management of the NATIONAL SERVICE PROGRAMME

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি’র পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তনের সুপারিশ টিআইবি’র

ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০১৩: বেকার যুবকদের জন্য গৃহীত সরকারের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

আজ রাজধানীর ব্রাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি: সুশাসনের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করে কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় বহুবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ১৩ দফা সুপারিশ প্রস্তাব করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মো. রফিকুল হাসান এবং প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) নীনা শামসুন নাহার। উল্লেখ্য, কর্মসূচির আওতাধীন ১৯টি উপজেলার মধ্যে ১১টি উপজেলা থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে গবেষণার জন্য তথ্য সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে সুবিধাভোগীদের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সুবিধাভোগীদের সামাজিকভাবে সম্মান ও গুরুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, নারীর বাইরে আসা ও কাজ করার মানসিকতা তৈরি, সরকারি বিভিন্ন বিভাগে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি, সুবিধাভোগীদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন, কর্মসূচিভুক্ত এলাকায় আর্থিক লেনদেন ও অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি, অর্জিত অর্থ সমিতির মাধ্যমে কাজে লাগানো; প্রাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসার সম্প্রসারণ, সঞ্চয় বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন, বিকল্প আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সংস্পর্শে প্রশিক্ষণের সুযোগ গ্রহণ ইত্যাদি।

তবে কর্মসূচির পরিকল্পনা, সুবিধাভোগীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা গেছে। এছাড়া নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে ধারণাপত্রে উল্লিখিত অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার তুলনায় বাস্তবে অনেক বেশি প্রার্থীর আবেদনের প্রেক্ষিতে সবাইকে সুযোগ দান (শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তি), প্রকৃত বেকার নির্ধারণে জরিপ কার্যক্রমের ত্রুটি, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের সুযোগ পাওয়া, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের সুযোগ পাওয়া, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে দায়িত্বে অবহেলা, বেকার না হয়েও কাজ পাওয়া, নিয়মিত চাকুরি ছেড়ে অংশগ্রহণ, একইসাথে একাধিক চাকরি করা, অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে দুই বছরের ছুটি নিয়ে অংশগ্রহণ, ব্যবসার পাশাপাশি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি, বয়স, জেলার বাসিন্দা, শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ দিয়ে আবেদন করা ও অন্যের নাম ব্যবহার করে অংশগ্রহণ করা। এছাড়া যোগ্যতার শর্ত পূরণ না হওয়ায় কারণে অন্তর্ভুক্তির জন্য ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ হওয়ার পরও অর্থ আদায় করা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তির জন্য অগ্রিম ১০,০০০-২০,০০০ টাকা আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কর্মসূচি সম্পর্কে সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসূচিটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া, ‘সাপ্লাই ড্রিভেন’ হওয়ার কারণে নিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কর্মসূচির সমন্বয়হীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, সরকার পরিবর্তনে কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা, অংশগ্রহণকারী নিয়ে সরকারের ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয় সুষ্পষ্ট না থাকা, লোকবলের প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করা, বাজেট স্বল্পতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ইত্যাদি সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। তথ্যের সরবরাহের ঘাটতির কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অংশগ্রহণ ও প্রাপ্য সুবিধা প্রাপ্তিতে যোগসাজশ ও ক্ষেত্রবিশেষে জোরপূর্বক দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের বিনিময় হয়েছে। কর্মসূচির ওপর অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর আর্থিক নির্ভরতা তৈরি, কর্মসূচি শেষ হলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়া, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধির আশংকা, সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অভাবে কর্মসূচিটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় নি। কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনে এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণকালে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণের উপর বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে এ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জিত হয় নি। তবে পরবর্তী পর্যায়ে এ প্রকল্প চলমান থাকলে প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে যুবকদের কর্মসংস্থানে বিশেষ অবদান রাখতে পারে।

কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে প্রতিবেদনে ১৩ দফা সুপারিশ করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন; কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ও অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন; দক্ষ ও যোগ্যদের পরবর্তীতে শূন্যপদে নিয়োগের পরিকল্পনা; মাসিক হারে নিয়মিত ভাতা প্রদান নিশ্চিত করা; প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন; সংযুক্ত প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রকৃত লোকবলের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নিয়োগ প্রদান; সমন্বয় কমিটিতে অংশগ্রহণকারী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা ইত্যাদি। এছাড়া ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, সমন্বয় কমিটিগুলো সক্রিয় ও কার্যকর করা এবং আর্থিক অনিয়ম বন্ধে তদারকি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

Media Contact