• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

Parliamentary Oversight on Defence: Bangladesh in the High Risk Category (Bangla)

বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর উপর সংসদীয় নজরদারী দুর্বল

বাংলাদেশে সংসদীয় নজরদারীর ঘাটতির কারণে প্রতিরক্ষা খাত অতি উচ্চমাত্রার দুর্নীতির ঝুঁকিতে

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদন

ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য কর্তৃক আজ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ৮২টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশেরই সংসদ স্ব স্ব দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্রবাহিনীর উপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিরক্ষা নীতির উপর কার্যকর নজরদারীর ঘাটতি রয়েছে ৮৫ শতাংশ দেশের ক্ষেত্রে।

আজ ব্রাসেলস থেকে ‘ওয়াচডগস? ৮২টি দেশে প্রতিরক্ষা খাতের উপর সংসদীয় নজরদারীর গুনগত মাত্রা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয় সংসদীয় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির “অতি উচ্চমাত্রা”র ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ২১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের সাথে একই পর্যায়ে রয়েছে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাহরাইনের মতো দেশ।

প্রতিবেদনে ৮২টি দেশকে দুর্নীতির ঝুঁকির বিচারে ৬টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। এ ৬টি ভাগ হল: সর্বনিম্ন ঝুঁকি সম্পন্ন (৪টি দেশ), নিম্নঝুঁকি সম্পন্ন (১২টি দেশ), মধ্যম ঝুঁকি সম্পন্ন (১৪টি দেশ), উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (১৭টি দেশ), অতি উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন (বাংলাদেশসহ ২১টি দেশ) এবং চরম ঝুঁকি সম্পন্ন (১৪টি দেশ)। প্রতিবেদন অনুযায়ী “চরম” ঝুঁকিতে রয়েছে ১৪টি দেশ যাদের মধ্যে আলজেরিয়া, মিশর, ইরান, লিবিয়া, কাতার, শ্রীলংকা, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং ইয়েমেন অন্যতম। অন্যদিকে “সর্বনিম্ন” ঝুঁকিতে রয়েছে মাত্র ৪টি দেশ এগুলো হল: অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া রয়েছে “নিম্ন” ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায়। “মধ্যম” ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, ইতালি, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং ইসরাইল, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়ার অবস্থান রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায়।

উল্লেখ্য, ৮৩.৩ থেকে ১০০ নম্বর প্রাপ্ত দেশগুলি সর্বনিম্ন ঝুঁকি সম্পন্ন, ৬৬.৭ থেকে ৮৩.২ পর্যন্ত স্কোর নিম্ন ঝুঁকি সম্পন্ন, ৫০ থেকে ৬৬.৬ স্কোর মধ্যম ঝুঁকি সম্পন্ন, ৩৩.৩ থেকে ৪৯.৯ পর্যন্ত স্কোর উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন, ১৬.৭ থেকে ৩৩.২ পর্যন্ত অতি উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন এবং ০ থেকে ১৬.৬ পর্যন্ত চরম ঝুঁকি সম্পন্ন। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর ৩২।

বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ২৯ ধরনের দুর্নীতির ঝুঁকি বিদ্যমান এবং দুর্নীতির কারণে বিশ্বের সামরিক খাতে ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে প্রতিবেদনভুক্ত ৮২টি দেশের সামরিক ব্যয়ের সামগ্রিক পরিমাণ ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৯৪ শতাংশ। টিআই যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা খাতের ২৯টি দুর্নীতির ঝুঁকিকে ৫টি ভাগে ভাগ করেছে, সেগুলো হল: রাজনৈতিক, আর্থিক, জনবল সংশ্লিষ্ট, পরিচালনা এবং ক্রয় সংক্রান্ত।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থায় সংসদীয় জবাবদিহিতা আনা সময়ের দাবি, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে একদিকে ক্রমবর্ধমান হারে বড় ধরনের ক্রয় অন্যদিকে এ বিষয়টিকে যেভাবে কোন প্রকার আলোচনা, বিতর্ক ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে এক আলাদা জগৎ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জন্য মঙ্গলদায়ক নয়। সার্বিকভাবে সংসদ ও বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় কমিটি যদি সশস্ত্র বাহিনীর আয়-ব্যয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারে, তাহলে কে পারবে?” তিনি আরো বলেন, “শুধুমাত্র সামরিক একনায়কতন্ত্র বা সামরিক বাহিনীর প্রভাব বলয়ে পরিচালিত সরকার ছাড়া বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশে এই ধ্রুব সত্যকে মেনে নেয়া হয় যে সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের নজরদারীতে থাকবে। অথচ এই নজরদারী প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার এ বৈশ্বিক চিত্র গভীর উদ্বেগজনক।”

আলোচ্য প্রতিবেদনটি টিআই যুক্তরাজ্য কর্তৃক এ বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘গভর্নমেন্ট ডিফেন্স অ্যান্টি করাপশন ইনডেক্সে’র তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত। প্রতিরক্ষা বিষয়ে সংসদীয় সক্ষমতা নিরূপনের জন্য ১৯টি প্রশ্নের মাধ্যমে যে ৭টি বিষয় বর্তমান প্রতিবেদনে বিশ্লেষিত হয়েছে সেগুলি হল: প্রতিরক্ষা বাজেট নজরদারী ও বিতর্ক, প্রতিরক্ষা বাজেটের স্বচ্ছতা, বহির্নিরীক্ষা, প্রতিরক্ষা নীতি, গোপন বাজেট, গোয়েন্দা তথ্য, এবং প্রতিরক্ষা ক্রয়ের পদ্ধতি এবং নজরদারী।

প্রতিরক্ষা নীতি, নজরদারী এবং বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক দেশে সর্বনিম্ন মাত্রার আনুষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। অতি কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে ১৫ শতাংশ দেশের ক্ষেত্রে। এক তৃতীয়াংশ দেশের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাজেট বহির্নিরীক্ষা করা হলেও সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা বাজেট ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ দেশে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সীমিত তথ্যের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ৭৫ শতাংশ দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যয় জনসমক্ষে প্রকাশ করে না। ৮২টি দেশের মধ্যে অর্ধেকের ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা বাহিনীর নীতি, বাজেট এবং প্রশাসনিক ব্যাপারে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র নজরদারীর প্রমান পাওয়া যায় নি। ৪০ শতাংশ দেশের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ক্রয়ের নজরদারী পদ্ধতি প্রমান মেলে নি কিংবা যে ক্ষেত্রে নজরদারী পদ্ধতি রয়েছে তা নিস্ক্রিয় এবং কার্যক্রম অত্যন্ত অস্পষ্ট। দুই তৃতীয়াংশ দেশের ক্ষেত্রে বহির্নিরীক্ষা ব্যবস্থার কথা জানা গেলেও সেগুলোর কার্যকারিতা হয় প্রশ্নবিদ্ধ, নয় তো বহির্নিরীক্ষা আদৌই সংঘটিত হয় কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা বাজেট নজরদারী ও বিতর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বরের শতকরা হার ২৫%, প্রতিরক্ষা বাজেটের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ৩৮%, বহির্নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ৫০%, প্রতিরক্ষা নীতির নজরদারী ও বিতর্কের ক্ষেত্রে ৩৮%, গোপন বাজেট তদারকির ক্ষেত্রে ১৩%, গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারীতে ০% এবং প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৩৮%

প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপর সংসদীয় নজরদারীর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য দুটো কৌশলের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। এর প্রথমটি হল প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক গ্রুপ গঠন যেখানে সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা ছাড়াও সুশীল সমাজ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং বিষয় বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

দ্বিতীয় কৌশলটি হল সরকারের নির্দেশে অডিটর জেনারেলের নেতৃত্বে গঠিত একটি নিরপেক্ষ রিপোর্টিং সংস্থা যারা প্রতিরক্ষা বাজেটের অপব্যবহার বা অপচয় সংক্রান্ত তথ্য সংসদ সদস্য এবং জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। উক্ত সংস্থা প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা অনুসন্ধান করে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংসদের কাছে প্রতি বছর উপস্থাপন করবে।

প্রতিবেদনে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, অডিট অফিস এবং সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের জন্য ১৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হল:

সংসদ

. সর্বদলীয় প্রতিরক্ষা কমিটি প্রতিষ্ঠা করে সরকার ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উক্ত কমিটির নিকট প্রমাণসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

. প্রতিরক্ষা বাজেটের গোপনীয় ব্যয় এবং গোয়েন্দা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনার জন্য বিশেষায়িত সংসদীয় কমিটি গঠন করা।

. প্রতিরক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

. প্রতিরক্ষা বাজেটে দুর্নীতির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা সহায়তা গ্রহন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা।

নির্বাহী বিভাগ

. সংসদ সদস্যরা যেন গোপন বাজেট ও গোয়েন্দা বিষয়সহ প্রতিরক্ষার সকল বিষয়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধি ও অর্থ বরাদ্দ করা।

. প্রতিরক্ষা বাজেট সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং যাবতীয় কাগজপত্র সংসদকে প্রদান করা। সংসদ থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর ও তথ্য সময়মত ও পরিপূর্ণভাবে প্রদান করা।

. সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটিকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রদান যেন তারা প্রতিরক্ষা বাজেট নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনে ভেটো প্রদান করতে পারে। এই ক্ষমতা গোপন বাজেট এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় স্থগিত করা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।

. প্রতিরক্ষা তথ্যের শ্রেণীকরণ ও গোপনীয়তার মাত্রা সুনির্দিষ্টকরণে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা।

. প্রতিরক্ষা ব্যয় নিরীক্ষার জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন অডিট অফিস প্রতিষ্ঠা করা এবং এর প্রতিবেদন জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা।

অডিট অফিস

. সংসদ সদস্য ও জনগণের জন্য সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ এবং বিস্তারিত অডিট প্রতিবেদন সময়মত প্রকাশ করা।

. নিরীক্ষা পরিচালনার পূর্বে কারিগরি ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য সংসদ সদস্যদের সাথে আলোচনা করা।

. প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে অডিট অফিসের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা এবং অডিট রিপোর্ট ব্যাখ্যা করা।

সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম

. প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবী জোড়ালো করা, প্রতিরক্ষা বাজেট, গোপন বাজেট এবং গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকাণ্ড পরীক্ষা নিরীক্ষার লক্ষ্যে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের জন্য সংসদ ও সরকারের সাথে এডভোকেসি করা।

. প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং এই খাতের নজরদারীর উন্নয়নে সংসদ সদস্য বা সরকার সহায়তা চাইলে তা প্রদান করা।

. প্রতিরক্ষা ব্যয়ের উপর সংসদের নজরদারীর গুরুত্ব সম্পর্কে জন বিতর্ক এবং চাহিদা সৃষ্টিতে কার্যক্রম গ্রহন করা।

উল্লেখ্য, আজকে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি government.defenceindex.org/parliaments এই ঠিকানায় পাওয়া যাবে।

Media Contact