• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

দুর্নীতি মোকাবিলায় হুমকি আসবেই : বিশেষ সাক্ষাৎকারে হোসে কার্লোস উগাজ

পেরুর নাগরিক আইনের অধ্যাপক, হোসে কার্লোস উগাজ সানচেজ-মরিনো দুর্নীতিবিরোধী বৈশ্বিক সংগঠন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর। টিআই পেরুর সাবেক সভাপতি আইনজীবী হিসেবে তাঁর দেশে সাবেক প্রেসিডেন্ট ফুজিমোরি এবং ফুজিমোরির পরিবার ও তাঁর প্রায় দেড় হাজার সহযোগীরবিরুদ্ধে দুই শরও বেশি দুর্নীতির মামলা পরিচালনা করেছেন। তাঁর উদ্যোগের ফলে ফুজিমোরি ও তাঁর সহযোগী ব্যক্তিদের পাচার করা অর্থের প্রায় ১৫কোটি ডলার বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা এবং আরও কুড়ি কোটি ডলারের হিসাব বন্ধ করা সম্ভব হয়। টিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি‘দুর্নীতিবাজের মুখোশ খুলে দাও এবং বিচারহীনতা নয়’ শীর্ষক দুটিপ্রচারাভিযান শুরু করেন। ঢাকায় তাঁর সংক্ষিপ্ত সফরকালে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি প্রথম আলোর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবদিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কামাল আহমেদ ও আয়েশা কবির

 
প্রথম আলো: আপনার এই সং‌ক্ষিপ্ত সফরকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপনি মতবিনিময় করেছেন। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ও তাদের কার্যক্রমের পটভূমিতে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি কী ধারণা পেলেন?
উগাজ: মূলত আমি আমাদের নিজস্ব সংগঠনের স্থানীয় শাখা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আর আমি বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশে আমাদের শাখাটি তৎপর এবং খুব শক্তিশালী। অন্তত ৪০টি জেলায় টিআইবির স্থানীয় শাখা আছে। একবিকেলে আমরা ৩০০ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাঁরা বাংলাদেশে টিআইবির সব অফিসে কাজ করছেন। আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের শক্তিশালী উপস্থিতির এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আর তাঁরা বাংলাদেশে দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রথম আলো: আপনি বলেছেন বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের উপস্থিতি শক্তিশালী। আমরা এটাও শুনেছি যে বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের তৎপরতা অন্যান্য দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু আপনি নতুন একটি আইন সম্পর্কে শুনেছেন এবং আইনটি নাগরিক সমাজের অধিকার খর্ব করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবেন কি?
উগাজ: সক্রিয় নাগরিক সমাজ দুর্নীতি মোকাবিলায় যখন হিমশিম খায়, তখন সঠিকভাবে কাজ করলে হুমকি আসবেই। যখন সবকিছু ঠিকভাবে চলে, তখন সেটা তুলে ধরা যেমন আমাদের কাজ, ঠিক তেমনি যখন তা ঠিকভাবে চলছে না, তখন সমালোচনা করাও আমাদের কাজ। আপনি জানেন, প্রতিবছর আমরা দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) প্রকাশ করি। আর বাংলাদেশ যেহেতু দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে পদ্ধতিগতভাবে খুব নিচু অবস্থানে পড়ে যাচ্ছে, তাই সরকার আমাদের এই সিপিআই পছন্দ করে না এবং টিআই এই দুর্নীতির পরিমাপ করুক, সেটাও তারা অপছন্দ করে। কারণ, তারা মনে করে আমাদের এই পরিমাপপদ্ধতি সঠিক নয় এবং এখানে হয়তো কোনো গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। আমরা এ রকম ঘটনায় অভ্যস্ত। কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই এটা হয়। তাই যখন কোনো সরকার আমাদের প্রতি খুব খুশি হবে, তখন বুঝতে হবে আমরা আমাদের কাজটি ঠিকমতো করছি না। নতুন যে আইনটি করা হয়েছে, তা আমাদের সংগঠন ও অন্যদের জন্য-যাদের নিয়ে সরকার অস্বস্তিতে আছে-তাদের জন্য হুমকি।
আমি মনে করি, সরকার বা প্রধানমন্ত্রী একটা বিষয় এখানে বুঝতে পারছেন না। আমরা শত্রু নই, দুর্নীতিই শত্রু। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও বেসরকারি খাতে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই শত্রু। তারা গুটি কয়েক ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। আমরা এটা দেখিয়ে দিচ্ছি এবং জনসম‌ক্ষে প্রকাশ করছি। নীতি প্রণয়ন, গবেষণা ইত্যাদি কাজে সরকার ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাহায্য করাই আমাদের এ কাজের লক্ষ্য। কী ঘটছে, তা-ই আমরা তুলে ধরছি। আমাদের প্রতিপক্ষ মনে করা সরকারের উচিত নয়। আসলে আমরা তো রাজনীতি করি না। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। আমাদের মূলনীতিগুলোর একটি হচ্ছে, রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের অবশ্যই নিরপেক্ষÿথাকতে হয়। তাই আগামীকাল যদি বিরোধীরাই সরকারে আসে, নিশ্চিতভাবে তারাও আমাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। কারণ, তারা যদি ঠিকমতো কাজ না করে, আমরা এখনকার মতোই একই ভূমিকা তখনো পালন করতে থাকব।
প্রথম আলো: আপনাদের যুক্তি হলো, আপনারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিচ্ছেন না। আর সরকারের যুক্তি, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সেটা কমিয়ে আনছে। তারা আরও বলছে, বাংলাদেশে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেসব তারা ক্ষমতায় আসার আগেই হয়েছে। আগের সরকারই এর জন্য দায়ী।
উগাজ: এটা সম্ভবত সত্যি। আমরা বলছি না যে তারা দুর্নীতি উদ্ভাবন করেছে। দুর্নীতি একটা ঐতিহাসিক সমস্যা। আমরা যেটা বলছি তা হলো, এখন তারা সরকারে থাকায় তাদের ক্ষমতা ও সম্পদ আছে এবং আমরা আশা করি, নির্বাচনের সময় তারা যেসব অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো তারা পূরণ করবে।
পরিবেশ পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব না হলেও তার উন্নতি ঘটানো সব সময়েই সম্ভব। আমরা বিশ্বজুড়ে দেখেছি, কয়েকটি দেশ আছে, যারা সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক ইচ্ছার কারণে নিজেদের পরিবেশ বদলাতে পেরেছে। বতসোয়ানা একটা উদাহরণ। এটা আফ্রিকার একটা দেশ, বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি দরিদ্র। তবে সেখানে একটা রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার যথেষ্ট প্রকাশ ঘটাতে পেরেছে এবং পরিবেশটা বতসোয়ানার জনগণের কল্যাণের জন্য বদলে দিয়েছে। তাই আমরা অন্যান্য দেশের সরকারকেও একই পথ অনুসরণ করতে বলছি। তথাকথিত বিরোধী ও সুশীল সমাজের মধ্যে প্রতিপক্ষ না খুঁজে কেন আপনারা দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশ পাল্টাতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন না?
আমরা অবশ্যই বুঝতে পারি যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টি পুরো সরকারের ভেতরে একরকম থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে আমার আলাপ হলো। এটা ছিল বেশ চমৎকার অভিজ্ঞতা। মনে হলো, তিনি আমাদের কাজকর্মকে সত্যিকার অর্থেই গুরুত্ব দেন এবং তিনি প্রকাশ্যেই টিআইবির ধারাবাহিক কাজকর্মের প্রশংসাও করলেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের গত কয়েক বছরের কাজের প্রশংসাও করলেন তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানের সঙ্গেও সেদিন সকালে বৈঠক করলাম। আমরা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছি। টিআই হলো একটি জোট, শতাধিক দেশে কাজ করছে। তাই পৃথিবীর যেখানে যেখানে ভালো কাজ হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে অন্যান্য জায়গার সংযোগ গড়ে দেওয়ার সুযোগ আমাদের আছে। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুকূলেও আমরা এ কাজটা করতে পারি। আমরা দেশটির জন্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারি, কমিশনের ক্ষমতায়নের বিভিন্ন পথ দেখানোর জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এনে দিতে পারি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটিকে আরও কার্যকর হতে সহায়তা দিতে পারি। তিনি আমাদের ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, টিআইবির কাজকে তিনিও গুরুত্ব দিয়েছেন। আর কমিশন কিছু বিষয় চালুর ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে চায়। এ বিষয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করার আশাও প্রকাশ করেন। তাই যখন সুযোগ থাকে এবং আলোচনা উন্মুক্ত হয়, সরকার দুর্নীতিবিরোধী কাজের অংশীদার ও সহযোগী হিসেবে আমাদের পাবে।
যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে তারা মনে করে সুশীল সমাজের ক্ষেত্র সংকুচিত করে আনা ভালো, সুশীল সমাজ বা সংগঠনগুলোকে আঘাত করতে হবে, আমাদের হুমকি দিতে হবে, তাহলে সে‌ ক্ষেত্রে আমাদের জবাব দিতে হবে, যেমনটা নাগরিক সমাজে আমরা করে থাকি।
প্রথম আলো: কী ধরনের জবাবের কথা বলছেন?
উগাজ: পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। বিশ্বের অনেক দেশের সরকার আমাদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে। তাই আমরা ঘটমান বিষয়াদির ব্যাপারে উদ্বেগ জানাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংহত করতে পারি। আমাদের কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। রাশিয়ায় আমাদের শাখা আছে, সেখানকার কর্মীরা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে কাজ করছেন। তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তাঁরা আত্মপক্ষÿসমর্থন করছেন এবং সফলও হচ্ছেন। ভেনেজুয়েলায় আমাদের শাখার কর্মীরা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসনের স্থায়ী হুমকির মধ্যে কাজ করছেন। এসব জায়গায় আমাদের সংগঠনের প্রতি বিস্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে।
নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে যাওয়া সহজ নয়। কারণ, প্রতিটি দেশে আমাদের অনেক অভ্যন্তরীণ সহযোগী আছে, যারা আমাদের অবস্থানকে সুর‌ক্ষিত করতে আমাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমি আশা করি। যারা জনস্বার্থে ও রাজনৈতিক স্বার্থহীনভাবে কাজ করছে বলে সবাই জানে, কর্তৃপক্ষ যদি এমন সংগঠনগুলোর পেছনে লাগে, তাহলে তা আসলে তাদেরই বিব্রত করবে।
প্রথম আলো: দুদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে তারা সরকারবিরোধী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠ রোধ করতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, অভিযোগটা হলো, বেছে বেছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের ল‌ক্ষ্যেই আইনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনাদের কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি?
উগাজ: এটা হতে পারে। এটাই প্রথম নয় বা প্রথম দেশ নয়, যেখানে এ রকম ঘটেছে। অনেক দেশেই দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সরকারের নির্বাহীরা নিজ নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছেন প্রতিপ‌ক্ষের ওপর আক্রমণ চালাতে অথবা সরকারের তথাকথিত শত্রুদের পেছনে লাগতে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যানের ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভালো ও ইতিবাচক। আমি মনে করি, তিনি ভালো কিছু করার ইচ্ছা রাখেন। আমরা কিছু কঠিন ও সংবেদনশীল বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছি। তিনি কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন এবং একই সঙ্গে আমি বুঝতে পারি, তিনি নিজ দপ্তরে পরিবর্তন আনছেন। তিনি কিছু মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছেন এবং অন্যদের নিয়ে আসছেন। আর আমরা তাঁর ওপর আস্থা রাখি। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব যে তিনি এই কমিশন পরিচালনার জন্য যোগ্য ব্যক্তি। তা যদি না হয়, আমরা অবশ্যই সেটা প্রকাশ্যে ও জোরালোভাবে বলব।
প্রথম আলো: আরেকটি বড় সমালোচনা হলো, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স আদর্শ উপকরণ নয় আর এতে দুর্নীতির বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয় না। যেমন: বড় বড় ব্যবসা, দেশের বাইরের বিনিয়োগকারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য ও মতামতই এই সূচকে বেশি প্রতিফলিত হয়। অথচ, বড় বড় করপোরেশন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় বিনিয়োগকারীদের দুর্নীতির তথ্য আড়ালেই থেকে যায় বা হারিয়ে যায়। কীভাবে এই সমালোচনার জবাব দেবেন?
উগাজ: যদি ড্যানিশ বা সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান বা ফিনিশদের জিজ্ঞেস করেন, আপনাকে তারা বলবে সিপিআইয়ে (করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স) তারা খুবই খুশি। তারা আমাদের কার্যপদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতায় সত্যিকারের আস্থা রাখে। অবশ্যই যদি আপনি ভালো অবস্থানে থাকেন, এটাকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মনে করবেন। আর যদি নিজেকে একটি খারাপ অবস্থানে দেখতে পান, আপনার অনুভব ও আস্থায় এটাকে সুন্দর মনে হবে না।
আমরা কখনো বলিনি যে বিশ্বে দুর্নীতির পরিস্থিতি পরিমাপের জন্য সিপিআই একটা শতভাগ নির্ভুল পদ্ধতি। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ উপলব্ধিই (পারসেপশন) বাস্তবতা। আর এখানে আমি বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিম উলফেনসনের একটা উদ্ধৃতি দেব। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে প্রথম ব্যক্তি, যিনি খুব খোলামেলা কথা বলতেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি একটা ক্যানসার, যা দারিদ্র্য বাড়ায় এবং শাসনপ্রক্রিয়া ও উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। উলফেনসন বলেন, একটা দেশে গিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার ও অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো হোটেলে ঢোকার সময় কথা বলে দেশটির কে কত সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে, তা জানতে তাঁর কেবল ১০ মিনিট লাগবে। সবাই জানে। পেরু বা হাইতির মতো একটা দেশে এটা অদ্ভুত ব্যাপার, যেহেতু এটা কোনো প্রযুক্তিগত পরিমাপ নয়। তাই পেরু বা হাইতিতে এটা দুর্নীতি পরিস্থিতি নয়। আমরা যদি মাঠপর্যায়ে গিয়ে পেরু ও হাইতিকে সিপিআইয়ের ভিত্তিতে যাচাই করি, সেটা বাস্তবতার কাছাকাছি হবে। তাই বাস্তবতা অস্বীকার করার চেষ্টাটা খারাপ নীতি।
সিপিআইয়ের সমালোচকেরা বলতে পারেন, বাংলাদেশে কোনো দুর্নীতি নেই। আমাদের ১০০-এর মধ্যে ৭৫ পয়েন্ট দেওয়া উচিত। কিন্তু এটা বাস্তবতার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে মেলে না। আমি এখানে আছি মাত্র দুই দিন। দুর্নীতি সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি। আমি পত্রপত্রিকা পড়লাম, লোকজনের সঙ্গে আলাপ করলাম, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললাম, কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও। সবাই স্বীকার করেন, এখানকার পদ্ধতি ও কাঠামোর মধ্যেই ব্যাপক দুর্নীতি আছে, দেশজুড়ে। সিপিআইয়ে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের আছে ২৫ অথবা ২৮। এতেই ওই দুর্নীতির ব্যাপকতার প্রতিফলন ঘটেছে।
প্রথম আলো: টিআইবি বাংলাদেশে সংসদ পর্যবেক্ষণ নিয়ে কাজ করছে। এটা কীভাবে টিআইবির কাজের অংশ হলো?
উগাজ: সাংসদেরা আইন প্রণয়ন করেন। আর তাঁরা নিজ নিজ আসনে জনপ্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই সংসদে যান। তাই তাঁরা কীভাবে কাজ করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন কি না অথবা দলীয় স্বার্থকে জনস্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য দেন কি না ইত্যাদি বিষয় যাচাই করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন আমরা দেখতে পাই সাংসদেরা দুর্ব্যবহার করছেন অথবা তাঁদের আচরণে সমস্যা আছে, তখন সেটা জনগণকে জানানো আমাদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব বলে মনে করি। তাই টিআইবি সাংসদদের সঙ্গে কাজ করছে বলে যে খবর পেয়েছেন, সেটা আমাদের কাজেরই অংশ।
আমরা বিশ্বাস করি, যখন সত্য তুলে ধরছি, কোনো কিছু উদ্ভাবন করছি না। এটাই বাস্তবতা। এসব ক্ষেত্রে আমরা শুধু ধারণার কথা বলছি না। যখন ধারণার কথা বলি, তারা বলে, কেন আপনারা ধারণার কথা বলেন? যখন সত্যিগুলো তুলে ধরি, তখন তারা বলে, না, এসব সত্যি নয়। আপনারা এখনো ধারণার কথাই বলছেন।
বুঝতে চেষ্টা করুন, এখানে নিরেট তথ্য-উপাত্ত আছে। আমাদের প্রতিবেদনের সমালোচনা করতে ইচ্ছুক প্রত্যেকে তা পড়ে দেখতে পারেন। আমরা অবশ্যই এটার পক্ষেÿকথা বলব। কারণ, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো: ভবিষ্যৎমুখী কোনো পরিকল্পনা আছে কি, যেটা আপনি আমাদের বলতে চান?
উগাজ: বৈশ্বিকভাবে আছে। আমরা এখন কৌশলপত্র ২০২০ চালু করেছি। আমরা নিজেদের কাজের তিনটি স্তম্ভকে প্রাধান্য দিয়েছি। এগুলোর একটি হলো জনগণের অন্তর্ভু‌ক্তি ও অংশীদারি। সবার আগে আমরা স্বীকার করি যে বিশ্বজুড়ে যে মাত্রার দুর্নীতি দেখেছি, সেটা কেবল একটা সংগঠনই মোকাবিলা করতে পারে। আমরা অনেক বড় এবং শতাধিক দেশে কাজ করলেও এটা যথেষ্ট নয়। তাই অন্যদের খুঁজে বের করতে হবে, যারা আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করতে চায়। আর এখন আমরা বিভিন্ন অংশীদারি বাড়াচ্ছি সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং শাসনপ্রক্রিয়া, দারিদ্র্য বিমোচন ও গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের সঙ্গে। এটা একটা দিক। অন্যদিকে আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের সঙ্গে আমাদের শক্তিশালী সংযোগ আরও বাড়াতে হবে। কারণ, বিশ্বের অনেক দেশে জনগণই দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আমি লাতিন আমেরিকা থেকে এসেছি। আর আপনাকে বলতে পারি যে গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস ও ব্রাজিলে কী হচ্ছে। আপনার আছে লাখ লাখ মানুষ, যাঁরা রাস্তায় নেমে দুর্নীতির নির্মূল চান। কারণ তাঁরা জানেন দুর্নীতির কারণে তাঁরা স্বাস্থ্য, আবাসন, পানি, পয়োব্যবস্থা প্রভৃতি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুর্নীতি তাঁদের জনগণকে হত্যা করছে। যখন এসব সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, আমরা সেখানে থাকতে চাই। আমরা নানা রকমের সহায়তা দিতে চাই। যেসব তথ্য-উপাত্ত এত বছরের গবেষণায় সংগ্রহ করেছি, সেগুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। এসবের সাহায্য নিয়ে আন্দোলনগুলো ইতিবাচক পরিণতি অর্জন করুক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এসব সামাজিক আন্দোলনের বড় বাধা হলো টিকে থাকা। আমরা চাই না আরও ‘আরব জাগরণ’ হোক, যেগুলো আকস্মিক বড় রকমের বিস্ফোরণের মতো শুরু হয় এবং হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর পরিস্থিতি সেই আন্দোলন শুরুর আগের চেয়েও খারাপ হয়ে পড়ে। তাই আমরা জনগণকে সম্পৃক্ত করতে চাই, বিশেষ করে তরুণদের। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি তরুণদের সেই শক্তি-সামর্থ্য ও প্রেরণা আছে, যা দিয়ে তাঁরা বাস্তব পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। আমার জন্য একটা বড় বিস্ময় হলো যে এখানে এসে দেখলাম টিআইবি, তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে জানলাম, তারপর বুঝলাম তারা অনেক বছর ধরেই জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বৈশ্বিক একটা আন্দোলন হিসেবে এটাই আমাদের শেখা দরকার। এ কারণেই আমি বলছি বাংলাদেশ একটা আদর্শ, যা বিশ্বে রপ্তানি করতে হবে, দুর্নীতি নিয়ে এখানে গত কয়েক বছরে যে রকম কাজ হয়েছে, সেটা।
আর যেসব বিষয়ে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি, তা হলো বড় ধরনের দুর্নীতি এবং আরেকটি হলো দায়মুক্তিকে না বলা। বড় ধরনের দুর্নীতির সংজ্ঞা নির্ধারণের জন্য আমরা গুরুত্ব সহকারে কাজ করেছি। গ্র্যান্ড করাপশন বা এ ধরনের দুর্নীতি সাধারণ দুর্নীতির চেয়ে ভিন্ন। ২৩ বছর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যাত্রা শুরু করার আগে যেমন দুর্নীতি হতো, এখন তার চেয়ে ভিন্ন রকমের দুর্নীতি হচ্ছে। যদি এখন আপনি কোনো সংবাদপত্র খোলেন বা টেলিভিশন চ্যানেল দেখেন, দুর্নীতির সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানতে পারবেন। আমরা শত শত কোটি ডলারের কথা বলছি, ইয়ানোকোভিচের ইউক্রেনে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার চুরি হয়েছে। ইকুয়েটরিয়াল গিনিতে ওবিয়াংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ শত শত কোটি ডলার লুটপাটের। আমরা পরিমাণটা গুনতে পারি না, কারণ তিনি এখনো সেখানকার প্রেসিডেন্টের পদে আছেন। অ্যাঙ্গোলার ডোস সা‌ন্তোস, তিউনিসিয়ার বেন আলী, ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলো ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি লোপাট করেছে। বড় বড় ব্যাংকের মাধ্যমেই এসব অর্থ পাচার হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মেক্সিকোয় মাদক চোরাচালানিরা ৮০ হাজার কোটি ডলার পাচার করেছে। সন্ত্রাসীদের একটি সংগঠন ৩০ হাজার কোটি ডলার ফ্রান্সের একটি ব্যাংকে পাচার করেছে। এই তালিকা অনেক বড়। প্রায় সব বড় ব্যাংক অর্থ পাচারে জড়িত। এটাকেই আমরা বড় ধরনের দুর্নীতি বা গ্র্যান্ড করাপশন বলছি।
ক্ষমতাধর লোকজন দুর্নীতি করেন, কারণ তাঁদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শক্তি আছে। তাঁরা বিপুল সম্পদ স্থানান্তর করতে পারেন। আর এতে মানুষের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে আপনার আর আমার দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটা বেশি হয়। আমাদের টাকা নিয়ে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তারা এই অবৈধ সম্পদ ভোগ করতে পারেন। এ ধরনের দুর্নীতি সাধারণত দায়মুক্তি পেয়ে যায়। কারণ, এগুলো শক্তিধর লোকেরা করেন। তাঁরা ক্ষমতায় থাকেন বলে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তাঁরা আত্মরক্ষার জন্য সেরা আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। এভাবে তাঁরা অত্যন্ত জটিল সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আমরা এই বিচারহীনতা বা দায়মুক্তির ব্যবস্থাটা ভেঙে দিতে চাই। আমরা সাধারণ মানুষের কাছে এসব তথ্য তুলে ধরতে চাই। আমরা দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করতে চাই, তাঁদের গল্প বিশ্বকে বলতে চাই। তাঁদের যদি বিচার না হয়, সামাজিক অবরোধ গড়ে তুলতে হবে। অনেক দেশে এসব দুর্নীতিবাজকে সাফল্যের উদাহরণ বা আদর্শ হিসেবে দেখানো হয়। কারণ, তাঁরা কোটিপতি। তাঁদের চমৎকার বাড়ি আছে সৈকতে। তাঁদের আছে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার আর বিলাসবহুল জীবন। সবাইকে জানাতে হবে যে এসব দুর্নীতি ও অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত বিলাসিতার প্রদর্শনী। তাই তাঁদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। তাহলে প্রত্যেকে পরিণতির কথা ভেবে বিরত হবেন দুর্নীতি থেকে। কারণ, এটা অপরাধ।
প্রথম আলো: বৈশ্বিক আর্থিক সততা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার বিদেশে স্থানান্তর হয়েছে। এর বেশির ভাগই বিদেশের ব্যাংকগুলোয় জমা করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কি বাংলাদেশ থেকে এসব অর্থ পাচারকারী ব্যক্তির মুখোশ উন্মোচনের ল‌ক্ষ্যে কিছু করতে পারে?
উগাজ: হ্যাঁ, আমরা পারি এবং সেই চেষ্টায় আছি। আমরা যা বলছি, এ ঘটনা তাকেই নিশ্চিত করে। ধারণা করতে পারেন, এত কোটি কোটি ডলার দিয়ে এ দেশে কী করা যেত? সব মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা যেত। বাংলাদেশের শিশুদের অনুকূলে সব ধরনের অবকাঠামো স্থাপন করা যেত। এ কারণেই আমাদের চিহ্নিত করতে হবে মূল অপরাধীদের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করতে আমরা প্রচার চালাচ্ছি। এই নিবন্ধনের মাধ্যমে জানা যেতে পারে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কারা চূড়ান্ত লাভবান হয়, যেখানে মূল মালিকেরা পরিচয় গোপন রাখে। তাই কেউ জানতে পারে কে অর্থ স্থানান্তর করছে। আমরা সাফল্য পাচ্ছি। জি টোয়েন্টি ইতিমধ্যে এসব নীতি গ্রহণ করেছে। ডেভিড ক্যামেরন যখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, লন্ডনে একটি সম্মেলন ডেকে ১২টি দেশকে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক নিবন্ধনের ওই ব্যবস্থায় স্বাক্ষর করান। যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ডেনমার্ক ইতিমধ্যে এটা গ্রহণ করেছে।
আমাদের পাচার হওয়া অর্থ অনুসরণ করতে হবে, তদন্ত করতে হবে পাচারকারী কারা। একবার তাদের চিনতে পারলে অনুসরণ করা যাবে। এতে তাদের কারাগারে নেওয়ার পাশাপাশি অর্থটা উদ্ধার করে জনগণকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। বাংলাদেশের ওই চোরাই অর্থ পুনরুদ্ধারের অধিকার আছে। এখন আমাদের আছে ইউএনসিএসি, জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালা। এতে বেশ কিছু বিধান আছে কীভাবে চোরাই অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হবে, সে বিষয়ে।
আমার দেশে সাবেক প্রেসিডেন্ট ফুজিমোরি দুর্নীতির দায়ে ২৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। তিনি ও তাঁর চক্র বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আমরা ৩৫ কোটি ডলার বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। তাই এটা সম্ভব। তবে আমাদের তথ্য দরকার এবং সেই তথ্যও অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তো নিতে হবে।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রের কথায় আসি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বজায় রাখতে হলে গণতন্ত্রকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
উগাজ: দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করা অসম্ভব। এটা সত্য যে দুর্নীতি কেবলই স্বৈরাচারী শাসক বা একনায়কদের শাসনে হয় না। অনেক গণতান্ত্রিক সরকারও দুর্নীতির মারাত্মক সমস্যায় নিমজ্জিত। অধ্যাপক ক্লিটগার্ড দুর্নীতি নিয়ে গবেষণায় সাফল্য পেয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি অনেকটা এইডসের মতো। এটা বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, আদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদির ভেদাভেদ মানে না। বিশ্বের অধিকাংশ স্বৈরাচারীর দুর্নীতির প্রমাণ আমরা অবশ্যই পেয়েছি। কিন্তু তথাকথিত গণতন্ত্রেও আমরা দুর্নীতির চিত্র পাই।
এটা সত্যি যে দুর্নীতি একতরফা কোনো সমস্যা নয়। তবে আমাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে যে দুর্নীতির বিস্তার অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ, দুর্নীতি দারিদ্র্য বাড়ায়। দুর্নীতি বৈষম্য তৈরি করে। দুর্নীতি শাসনপ্রক্রিয়ায় নানা সমস্যা নিয়ে আসে। ব্রাজিলের কথা বলতে পারি। সেখানে দুর্নীতির কারণে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এখন তদন্ত চলছে। আর নতুন প্রেসিডেন্টও সাবেক প্রেসিডেন্টের চেয়ে খুব একটা ভালো নন। তিনিও শিগগিরই সমস্যায় পড়বেন। কারণ, তাঁর দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্যও এখন সামনে আসছে। তাই এটা শাসনপ্রক্রিয়ার জন্যও একটা সমস্যা।
প্রথম আলো: দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিস্তর চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে দুর্নীতি উন্মোচনের একটা কার্যকর উপায় হতে পারে?
উগাজ: সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে খুবই শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন অনেক দেশে জনগণের সংহতি গড়তে এটা কাজে লেগেছে। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার ও অন্য কয়েকটি মাধ্যমে তরুণদের কয়েক মিনিটের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করা যায়। সংগঠনের জন্য এটা খুবই শক্তিশালী উপাদান। এই মাধ্যম ব্যবহার করে স্থানীয় দুর্নীতির ঘটনাবলি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। যদি কিছু শুরু করেন আর সেটা একটা প্রবণতায় মোড় নেয়, কয়েক মিনিটেই গোটা বিশ্ব জেনে যায়, কী ঘটছে। তাই হ্যাঁ, আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বাস রাখি। এই পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী কিছু উপকরণ তৈরির ল‌ক্ষ্যে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করছি।
প্রথম আলো: ধন্যবাদ আপনাকে।
উগাজ: ধন্যবাদ।
 

 

সাক্ষাৎকারটি ২৩-১০-১৬ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত। লিঙ্ক