• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ

জীবন ও জীবিকার জন্য সবুজ পরিবেশ ও পরিবেশবান্ধব ধরিত্রীর প্রয়োজনীয়তা এবং জীবজগত ও প্রকৃতির সুরক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৭৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৬-এর প্রতিপাদ্য ছিল্ত ‘বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ’। এর লক্ষ্য হলো- ধরিত্রীর পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণীকে সুরক্ষার মাধ্যমে বাসযোগ্য বিশ্ব গড়তে মানুষকে সচেতন করা। উল্লেখ্য, ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ১৫-এর মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন উজাড় রোধ করার মাধ্যমে মরুকরণ রোধ এবং ভূমিক্ষয় হ্রাসে জোর প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি গত ২২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭৫টির বেশি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘প্যারিস চুক্তি’তে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিশ্ব তথা দেশগুলো পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ সব ধরনের পরিবেশবান্ধব অভিযোজন কার্যক্রম ও জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন’ বলে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বন ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকার যেমন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে, তেমনি বন রক্ষার সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্তৃক অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের মাধ্যমে অবাধে কার্বন নিঃসরণের ফলে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই হয়নি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বন ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। নির্বিচারে বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণী বিশেষ করে হাতি, বাঘসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে একের পর এক প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করায় ক্রমেই বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে সার্বিকভাবে কৃষি বিশেষ করে ধানসহ পানিনির্ভর কৃষির রোপণ প্রক্রিয়া এবং এর উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে প্রকৃতির ওপর নিভর্রশীল বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম বনভূমি পরিবেষ্টিত দেশগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে বনভূমির হার মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আইন প্রয়োগে ঘাটতির কারণে নির্বিচারে বন নিধনের ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার হেক্টর বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভাওয়ালের শালবন। এরই মধ্যে বনটির প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়ে গেছে। এমনকি বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন নির্বিচারে গাছ নিধন, উজান থেকে মিষ্টি পানিপ্রবাহে ঘাটতির কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে হুমকির সম্মুখীন; লবণাক্ততার ফলে সুন্দরী গাছের আগা মরে যাচ্ছে ব্যাপকভাবে।
জীববৈচিত্র্যের এক বিপুল সম্ভার সুন্দরবন ৪৫৩টি প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল, যেগুলো আজ বিপন্নপ্রায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা একসময় ৪০০-৪৫০টি থাকলেও অপ্রতিরোধ্য চোরাইভাবে পাচারের ফলে বর্তমানে তা ১০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে। উপরন্তু পরিবেশ আইন ১৯৯৫-এর ধারা ৫-এর অধীনে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা বাফার জোন ঘোষণা করা হলেও এর ভেতর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ঝুঁকিতে ফেলার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজন ব্যয় আরো বেড়ে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য কখনই কাম্য হতে পারে না।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা এবং ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদী বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য, যোগাযোগ ও জীবিকার চালিকা হিসাবে কাজ করে। একদিকে উজানে অবস্থিত বিভিন্ন দেশ কর্তৃক আন্তর্জাতিক নদীর পানি এককভাবে প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ২০০০ সালের পরিবেশ আইন অনুসারে প্রাকৃতিক জলাধার বা মিষ্টি পানির প্রধান সংরক্ষণে আইনি বাধ্যতা থাকলেও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নির্বিচারে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড় ও অন্যান্য জলাশয় আশঙ্কাজনকভাবে বেদখল হচ্ছে। এসবের ফলে ছোট-বড় ২৩০টি নদীর ১৭৫টিই মৃতপ্রায় এবং প্রতি বছরই দু-একটি করে নদী নাব্যতা হারাচ্ছে। ঢাকায় বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা দখলের কারণে নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে এখন সাধারণ খালে পরিণত হচ্ছে।
একসময় দেশের মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে প্রচুর মাছ উৎপাদন হলেও বর্তমানে মোট আহরিত মাছের মাত্র দেড় শতাংশ এ দুটি নদ-নদী থেকে পাওয়া যাচ্ছে এবং অন্যান্য নদ-নদী প্রায় মাছশূন্য। নদীর নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, পানিতে রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্য মিশ্রণসহ নানা কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে মাছের উৎসগুলো। তাছাড়া আইন অমান্য করে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার না করে নির্বিচারে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যাসহ বিভিন্ন জলাশয় দূষণ করছে ডায়িং কারখানা ও ট্যানারিগুলোর একাংশ। শুধু তাই নয়, শিল্পায়নের নামে কলকারখানার সব ধরনের বর্জ্য এসব জলাশয়ে নিষ্কাশনের ফলে দূষণের মাধ্যমে ভূউপরিভাগের পানিদূষণ বাড়ছে। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে পরিবেশদূষণ রোধে দূষণ কর চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকা এবং দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় এখন পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সার্বিকভাবে একদিকে শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহে সংকট, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসবের ফলে সার্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য, মানুষের পানির অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা, সুষম উন্নয়ন ও বাস্তুসংস্থানসহ সর্বোপরি দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়ন হুমকির সম্মুখীন, যার প্রধান শিকার হবে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৬-এর স্লোগান ‘বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনের লক্ষ্য হুমকির সম্মুখীন জীবিবৈচিত্র্য, কৃষিকাজ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা ও বিকাশে সীমিত বনভূমিসহ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনকে রক্ষা; খাবার পানির অন্যতম উৎস নদী, খাল-বিল রক্ষার পাশাপাশি কার্যকর জলবায়ু অভিযোজনের জন্য চাহিদা জোরদার করা।
এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব করছে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, সুন্দরবনসহ সব বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়ে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ বিশেষ করে ‘বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩’ কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সব ধরনের জলাধার দূষণ ও দখল রোধ করার। সরকারি, বেসরকারি ও বাণিজ্যিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই উন্নয়নের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য জাতীয় ‘সেচ আইন’ প্রণয়নসহ সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর যথোপযুক্ত সংস্কার করতে হবে। পরিবেশদূষণ রোধ-সংক্রান্ত আইনের পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য নির্গমন-সংক্রান্ত বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ ও শিল্পদূষণ রোধে দ্রুত দূষণ কর চালু করতে হবে এবং সব ধরনের কলকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহার নিশ্চিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিভর্রযোগ্য, দক্ষ ও স্বাথের্র দ্বন্‌দ্ব নয়্ত এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেকোনো অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসাপেক্ষে অনুমোদন করতে হবে। ভূমি, নদী, জলাশয় ও জলমহালসহ সব প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার ও দখলের সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় ও অবস্থান নির্বিশেষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ, পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম-প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বিশেষত জনগণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সব কার্যক্রমে বিশেষ করে কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসীদের ব্যাপক ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবনের কাছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা প্রায় তিন কোটি লোক বিশেষ করে উপকূল অঞ্চলে কার্যকর অভিযোজনের জন্য আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীই বঞ্চিত হবে। সর্বোপরি ১৬ কোটি লোকের বসবাস ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ইট-পাথরের দালান তৈরি হয়তো সম্ভব হবে, তবে কোনো অবস্থায়ই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না- এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
 
-এম. জাকির হোসেন খান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
দৈনিক বনিক বার্তায় ০৬-০৬-১৬ তারিখে প্রকাশিত। লিঙ্ক