• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

একটি বিশ্ব, না করি নিঃস্ব

শতকোটি মানুষের অপার স্বপ্ন, একটি বিশ্ব, না করি নিঃস্ব’—স্লোগানে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারও ৫ জুন পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। শিল্পবিপ্লবের নামে উন্নত দেশগুলো কর্তৃক নির্বিচারে কার্বন নিঃসরণের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে শতকোটি মানুষের স্বপ্নের পৃথিবীর ভৌগোলিক, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ এবং বাস্তুসংস্থান স্থায়ী পরিবর্তনের সম্মুখীন। উন্নত দেশগুলো নির্বিচারে বনভূমি নিধন, অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশদূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়েছে। ফলে পৃথিবীর অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন।
গবেষকেরা বলছেন, বর্তমান হারে ভোগ এবং উৎপাদন বজায় থাকলে ২০৫০ সালে যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯৬০ কোটি, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য জোগাতে পৃথিবীর মতো কমপক্ষে তিনটি গ্রহ লাগবে, যা প্রকৃতই অসম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত দেশগুলোর নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বৃহৎ করপোরেট কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির ভেতর আনতে হবে। তাই শুধু জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবসার নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবুজবান্ধব টেকসই বাণিজ্য চুক্তি (গ্রিন এইড ট্রেড) প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক উন্নতির নামে বনাঞ্চল ও বিভিন্ন বাস্তুসংস্থান উজাড় করা হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তনে কৃষির রোপণ-প্রক্রিয়াতেও ঘটছে পরিবর্তন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য ধরিত্রীর আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে বনভূমির হার মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর দুই হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শালবন হারিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন হুমকির সম্মুখীন। তারপরও নির্বিচারে গাছ নিধন ও সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। এ কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু অভিযোজন ব্যয় আরও বেড়ে যাতে পারে।
২০১৪ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির পঞ্চম অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সমুদ্রস্ফীতিজনিত লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ৮ শতাংশ ও ৩২ শতাংশ হ্রাসসহ ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার আরও ১৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে আশঙ্কাজনক হারে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল নষ্ট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নগরগুলোও ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের এক-তৃতীয়াংশ নগরের দালানগুলো থেকে আসে।
দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা করে পানির পুনর্ব্যবহার ও দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়া, বর্জ্য পুনঃ চক্রায়ণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ভবন নির্মাণে টেকসই উপকরণ ব্যবহার করে ৩০ থেকে ৮০ শতাংশ জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয় সম্ভব। পরিবেশবান্ধব নগরের যাতায়াতব্যবস্থা হবে পরিষ্কার, সহজলভ্য ও যানজটমুক্ত। শুধু ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামের কারণে নাগরিকেরা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই পরিবেশবান্ধব টেকসই যাতায়াতব্যবস্থা গড়তে জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা উদ্ভাবন, নিরাপদে পায়ে চলা পথ ও বাইসাইকেল চালানোর সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশে নদ-নদী, খাল ও জলাশয় দখলের কারণে ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বিভিন্ন জলাশয় দূষণ করছে ডাইং কারখানা ও ট্যানারিগুলো, যা রোধে প্রস্তাবিত সবুজ কর কঠোরভাবে আরোপ করা উচিত। ঢাকা শহরে উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ বর্জ্য পুনঃ চক্রায়ণযোগ্য, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা বা পুনঃ চক্রায়ণের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় কমপক্ষে ১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় সম্ভব। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ÿক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রিডলাইন তৈরি করে যতখানি সম্ভব পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর ও বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা বিতরণে দক্ষতা সুনিশ্চিত করার ওপরই নির্ভর করছে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নগরের ভবিষ্যৎ। সার্বিকভাবে মানুষের কল্যাণ, পরিবেশ ও অর্থনীতির সচলতা নির্ভর করছে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সংযত ব্যবহারের ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত পদক্ষেপ, প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, যথার্থতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়ন এবং এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নিপতিত জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ সব মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি তুলতে হবে, ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই কেবল বাসযোগ্য পৃথিবী গড়া সম্ভব’।
 

এম জাকির হোসেন খান: টিআইবিতে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন বিষয়ে কর্মরত।
 
লিখাটি জুন ০৬, ২০১৫ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত। লিঙ্ক