একটাই সুন্দরবন

রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে ভূমিগ্রাস বন্ধ কর
সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাই জনমতের প্রতিফলন
ঢাকা, ১৫ এপ্রিল ২০১২

সুন্দরবন ও বিশ্ব ঐতিহ্য
সুন্দরবন বাংলাদেশের মোট সংরক্ষিত বনভূমির ৪১ ভাগ জায়গা জুড়ে অবস্থিত। ৪৫৩ প্রজাতির প্রাণীসহ অনেক বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যের এক বিপুল সম্ভার (লস্কর, ২০০০)। জীববৈচিত্র্য ছাড়াও প্রাকৃতিক দূর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে সুন্দরবন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ (Ramsar Site) ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে UNESCO সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সুন্দরবনই হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র  আবাসস্থল। বন বিভাগের সুত্রমতে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ৪০০-৪৫০।
 
সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। বাংলাদেশ সরকারের আহবানে সমগ্র দেশবাসী সুন্দরবনকে বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তমাশ্চর্য নির্বাচিত করতে ভোট প্রদান করেছে। বনটি রক্ষায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকার গত সেপ্টেম্বর ২০১১-তে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে।

প্রস্তাবিত রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং ভারত সরকারের পক্ষে ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) গত ২৯ জানুয়ারি, ২০১২ তারিখে যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপালে ১৩০০/২৬৪০ মেগাওয়াটের ‘কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ স্থাপনে চুক্তিবদ্ধ হয়। বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলা সংরক্ষিত সুন্দরবনের নিকটবর্তী এলাকা। সংরক্ষিত সুন্দরবনের বাফার জোনের একাংশে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের প্রস্তাব রেখে বিপিডিবি এবং এনটিপিসি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী এ কেন্দ্রটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ১৫শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চুক্তি অনযায়ী মোট মূলধনের ৩০ শতাংশ এনটিপিসি ও পিডিবি উভয়ে সমান অনুপাতে যোগান দিবে এবং সম্ভাব্য লাভ সমান অনুপাতে বন্টিত হবে। বাকি ৭০% অর্থ এনটিপিসি বিভিন্ন ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করবে (ডেইলি স্টার, ২১ আগষ্ট, ২০১১)। তবে ঋণের উৎস এবং ঋণের সুদের হার কত হবে তা এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয় নি (সাপ্তাহিক, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ধারণা করা হচ্ছে যে, কোন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলে তার আর্থিক দায় বর্তাবে বাংলাদেশের উপর।

কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ দূষণ ও আইনী কাঠামো
কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প যেসকল পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক) বিপুল পরিমাণ কার্বন এবং ছাইভষ্ম নি:সরণ দ্বারা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিশেষতঃ বায়ু এবং পানির (নিকটবর্তী নদীসমূহসহ) মারাত্মক দূষণ; খ) নির্গত গ্যাসের ভারি ধাতু, সালফার এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাসের সাথে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া; এবং গ) বর্জ্য পানির দ্বারা আশেপাশের জলাশয়ের পানি দূষিত করা । কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উপরোল্লিখিত পরিবেশ দূষণ বিবেচনায় ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর রক্ষিত এলাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ভারতের ইআইএ নোটিফিকেশন ২০০৬ অনুযায়ী, ভারতের বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন, ১৯৭২-এর অধীন সংরক্ষিত ঘোষিত কোন এলাকার ১০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, ভারতের মধ্যপ্রদেশে জনবসতিসম্পন্ন এলাকার কৃষি জমিতে এনটিপিসি’র ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক প্রকল্প স্থাপনে অনুমতি দেয়নি সে দেশের গ্রিন ট্রাইবুনাল। অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিলের দাবিতে ভারতের আদালতে মামলা রয়েছে ।  

বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান (তফসিল-১(ঘ)(৬) যা কেবলমাত্র শিল্প এলাকা, শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা বা ফাঁকা জায়গায় স্থাপিত হতে পারে। পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫-এর অধীনে সরকার প্রজ্ঞাপনমুলে  ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুৃর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। একই প্রজ্ঞাপনমূলে এরূপ এলাকায় যেসকল কার্যাবলী নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ক) প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংস বা সৃষ্টিকারী সকল প্রকার কার্যকলাপ; খ) ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট/পরিবর্তন করিতে পারে এমন সকল কাজ; গ) মাটি, পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন; এবং ঘ) মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতিকারক যে কোন কার্যাবলী।

পরবর্তীতে ২০১০ সালের প্রজ্ঞাপনমূলে  সরকার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৪০ হেক্টর, ৫৬০ হেক্টর ও ১৭০ হেক্টর নদী ও খালের জলাভূমি জলজ প্রাণী বিশেষত ‘বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন’ সংরক্ষণের স্বার্থে ‘‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” ঘোষণা করেছে। এতদসত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ উত্তর পূর্ব সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌ পথ চালু করায় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার ও মালবাহী কার্গো চলাচল শুরু করে যা অভয়ারণ্যের প্রাণীকূলের জন্য বিপদজনক হয়ে দেখা দেয়; পরবর্তীতে এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নৌরুট নিষিদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেন (মূখ্য তথ্যদাতা, ফেব্রুয়ারী, ২০১২)।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রথমে প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা বা আইইই (Initial Environmental Evaluation) দাখিল করে অবস্থানগত ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে। পরবর্তীতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত কার্যপরিধির ভিত্তিতে পরিবেশগত প্রভাব নিরুপন বা ইআইএ প্রতিবেদন দাখিল করে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের মাধ্যম বর্ণণা এবং প্রকল্প বিষয়ে জনমত যাচাই। পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের পূর্বে জমি অধিগ্রহণের আইনী কোন সুযোগ না থাকলেও  অবস্থানগত ছাড়পত্রে উদ্যোক্তা কর্তৃক ইআইএ দাখিলের সময় জমির মালিকানা দলিল দাখিল করতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে অধিগৃহীত জমি অব্যবহৃত থাকলেও তা প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত থাকায় সম্প্রতি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং জমি অধিগ্রহণে সতর্ক হবার সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবিত রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে উদ্বেগ
সংরক্ষিত সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিখিত পত্রের মাধ্যমে রামসার কর্তৃপক্ষ এবং ইউনেস্কো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে (পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ২০১২) । এ উদ্বেগের প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কি ব্যাখ্যা প্রেরণ করেছে তা জানা যায় নি। প্রস্তাবিত প্রকল্প বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর এ মর্মে মতামত (পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ২০১২) প্রদান করেছে যে, "A notable portion of Sunderbans falls under the Bagerhat district. Department of Environment is concerned about the possible adverse impact on the rich biodiversities of Sundarban Ramsar sites due to implementation of this said project”

প্রস্তাবিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে বন বিভাগ তীব্র আপত্তি উত্থাপন করে। প্রধান বন সংরক্ষক স্বাক্ষরিত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ এর এক পত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘‘Sundarbans Ramsar Site’’ সুন্দরবনের অংশ যার Legal Custodian বন অধিদপ্তর। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং Landscape Zone এ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের Royal Bengal Tiger তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।” উল্লেখিত পত্র দ্বারা প্রধান বন সংরক্ষক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সরাসরি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে কোন মতামত না দিলেও সুন্দরবনের মধ্য দিযে কয়লাবাহী জাহাজ চলাচল যে সুন্দরবনের রক্ষিত বনের ক্ষতি করবে সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করে। বন্যপ্রাণী প্রেমিক রোনাল্ড হালদার-এর মতে সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে জোয়ার-ভাটার কারণে এ প্রকল্পের বর্জ্য পানি আশেপাশের নদী ও জলাভূমির দূষণের মাত্রা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিবে। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা বলেশ্বর নদীর ঠিক পাশেই যা এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান মৎস্যক্ষেত্র। ফলে মৎস্য সম্পদ ও এর উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

এলাকাবাসীর মতে, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপিত হলে এ এলাকার বক, হাঁস, বিভিন্ন ধরনের অতিথি পাখি, পানকৌড়ি, বেজি, শিয়াল অস্তিত্ব হারাবে। নাব্যতা কমে যাওয়া পশুর নদী থেকে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পানি তোলা হলে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বর্জ্য এ নদীতে নিক্ষিপ্ত হলে নদীটি প্রাণ হারাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৪০০০ফুট বা এরও গভীর থেকে পানি তোলা হলে পানির স্তর এতো গভীরে নেমে যাবে যে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা অসম্ভব হবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই থেকে SO2 ছড়ানোর কারণে বন্য গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে যা পরবর্তিতে সুন্দরবন উজারের কারণ হবে। একইসাথে, এসিড নি:সরণের ফলে ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে বন্য প্রাণীর খাবার সংকট দেখা দেবে। ২০১০ সালের প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাং এসোসিয়েশনের রিপোর্টে অনুযায়ী, ‘‘কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মোট ৭৬% ভাগ এসিড গ্যাস এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই পরিবেশ দূষণের মূল কারণ’’ । বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে প্রেরিত পত্রে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে Super Critical এবং এতে কম জ্বালানি ব্যবহার করা হবে বলে উল্লেখ করলেও  পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাবিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বায়ু দূষণের পাশাপাশি এ কেন্দ্রের কঠিন ও তরল বর্জ্য পদার্থের আধিক্যে পানি দূষণ; ব্যাপক শব্দ দূষণ এবং উৎপাদিত পিএম ২.৫ নামে ক্ষতিকর উপাদানের ঘন মেঘমালার মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে তা পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন (সূত্র: মূখ্য তথ্যদাতা, জানুয়ারি, ২০১২)।

সর্বোপরি রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হবে সুন্দরবনের জন্য মরণফাঁদ। এ প্রেক্ষিতে, বিগত ২২ মার্চ ২০১২ তারিখে হাইকোর্ট হতে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান কেন বাতিল করা হবে না তা মর্মে সরকারকে রুল জারি করেছেন।

প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থানগত ছাড়পত্র
পরিবেশ অধিদপ্তর প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রামপালের প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুকূলে শর্ত সাপেক্ষে  অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদান করেছে (পরিবেশ অধিদপ্তর, ২৩ মে, ২০১১)। অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদান কালে প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকা যে সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার ৪ কিলোমিটারের মধ্যে এবং তা যে সুন্দরবনের সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটার বাফার জোনের মধ্যে অবস্থিত তা উল্লেখিত থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর তা আমলে নেয় নি। স্পষ্টত:ই অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর বন বিভাগের মতামত গ্রহণ করেনি।

প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদনে প্রকল্প সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকাটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছে। কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্যে/নিকটে হলেও প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থানগত ছাড়পত্র কোনটিতেই সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার উপর কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে কোন রকম আলোকপাত করা হয়নি। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে শিল্প এলাকা, শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা বা ফাঁকা জায়গা না হলেও রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বপক্ষে অবস্থাপনগত ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর যা সংস্থাটির এখতিয়ার বর্হিভূত।

প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদনে বিকল্প স্থান হিসেবে লবণচোড়া, খুলনার সম্ভাব্যতা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। লবণচোড়ায় বেশ পরিমাণ খাস জমি রয়েছে এবং রামপালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্থাপনা অপসারণ বা পুনর্বাসনের প্রয়োজন না হলেও কেবলমাত্র মংলা বন্দরের সাথে নৌযোগাযোগ ও প্রস্তাবিত খুলনা-মংলা রেল লাইনের তুলনামূলক সুবিধা বিবেচনায় রামপালকেই চূড়ান্ত স্থান হিসাবে মনোনয়ন করার সুপারিশ করা হয় সিইজিআইএস কর্তৃক প্রণীত প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের এমন যুক্তি সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরিপন্থী।

জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর সম্ভার বিবেচনায় সুন্দরবন দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য হলেও প্রাথমিক প্রতিবেশগত প্রতিবেদন চূড়ান্তকরণে সিইজিআইএস কোন বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করেনি। উপরন্তু প্রতিবেদন প্রস্তুতকালে প্রকল্প বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মত বিনিময়ের যে দাবি প্রতিবেদনে করা হয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকল্প বিরুদ্ধ প্রতিবাদ তার যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাথমিক প্রতিবেশগত প্রতিবেদনে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকার অতি নিকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও এর ফলে সুন্দরবনের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির কোন আর্থিক হিসাব করা হয়নি। উল্লেখ্য, মৎস্য সম্পদ, ঝড়-দূর্যোগ থেকে প্রতিরক্ষা, নির্মাণ ও জ্বালানী কাঠ এবং অন্যান্য অবদান বিবেচনায় প্রতি হেক্টর সুন্দরবনের মতো  উপকূলীয় বনের আর্থিক অবদান হতে পারে কমপক্ষে ৬১,০০০ ডলার (ওয়াইল্ড নেচার সায়েন্স, ভলিয়্যুম. ২৯৭, আগষ্ট ২০০২:৯৫০-৯৫৩)।

৩১ জানুয়ারী, ২০১১-এর মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইআইএ প্রতিবেদন প্রদান করার কথা থাকলেও অদ্যাবধি তা প্রদান করা হয়নি (পরিবেশ অধিদপ্তরের পত্র ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২)। ইআইএ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে জনমত যাচাই, সুন্দরবনের নাজুক প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও বিরল বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞ দ্বারা ইআইএ প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে রামসার সচিবালয় ও ইউনেস্কোকে অবগত ও সম্পৃক্ত রাখার বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোন দিক নির্দেশনা/সিদ্ধান্ত নেই।

প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের রুল থাকলেও এবং প্রদত্ত অবস্থানগত ছাড়পত্রে পরিবেশগত, কারিগরী ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হলে অবস্থানগত ছাড়পত্র বাতিল করা হবে মর্মে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও  ইআইএ প্রতিবেদন দাখিল না করে এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ না করে জোরপূর্বক প্রাথমিকভাবে অধিগৃহীত ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রকল্প এলাকার সকল জমির মালিকের প্রতিবাদ উপেক্ষা কওে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন ঘটিয়ে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ এপ্রিল ২০১২)। প্রকল্প এলাকার অধিবাসীগণ ২০১০ সালে ৩ ধারার নোটিশ পাওয়ার পর ১৮৩৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও মাত্র ৯০ একর জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ চিংড়ি চাষের জন্য জমি ইজারা গ্রহণকারী ব্যক্তি কিছু টাকা পেলেও তা ভূমি অধিদপ্তরকে ঘুষ দিয়ে গ্রহণ করেছেন (এফজিডি, ২০১২)। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় জনগণের উপর পুলিশী হয়রানির অভিযোগ  পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে খুলনার মেয়রের বিরুদ্ধে জমি অধিগ্রহণে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বলপ্রয়োগ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত অবস্থানগত ছাড়পত্রে পূর্ণ ইআইএ’র ভিত্তিতে অনুমোদন ব্যতীত জলাভূমি ভরাট না করার শর্ত আরোপ করা হলেও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে সব ধরনের ভূমি ভরাটের কাজ পরিলক্ষিত হয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়ার পূর্বে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি জনমতের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে “কর্তার ইচ্ছায় কর্ম” সম্পাদনের সমার্থক হবে।                            

অবস্থানগত ছাড়পত্রের শর্ত ভঙ্গের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কোন ভূমিকা গ্রহণ করেনি। জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও মানবাধিকার কমিশন অদ্যাবধি কোন পদক্ষেপ নেয়নি। আর প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ বিপর্যয়েও সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়ে পরিবেশবাদীদের সকল আবেদন ও বিদ্যমান আইনী বিধিবিধান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যাচেছ সরকার। গত ২৭ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে ১২জন বিশিষ্ট নাগরিক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট পত্র মারফত ও যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে সুন্দরবনের ওপর কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঝুঁকির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

আমাদের দাবি
-    সুন্দরবন অমূল্য জাতীয় সম্পদ। বিশ্ব ঐতিহ্য এ বনকে রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
-    সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে, বনটির ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অতি সন্নিকটে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
-    পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী কেবলমাত্র শিল্প এলাকা, শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা কিংবা ফাঁকা এলাকায় প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
-    সত্য গোপন করে ও চাতুর্যপূর্ণভাবে প্রণীত প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা (আইইই)-এর ভিত্তিতে প্রদত্ত অবস্থানগত ছাড়পত্র বাতিল করতে হবে এবং জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।
-    বিপিডিবি এবং এনটিপিসি এর মধ্যকার ২৯ জানুয়ারি, ২০১২ তারিখের চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রকল্পের ব্যর্থতার আর্থিক দায় কেবল এদেশের জনগণের উপর বর্তানো সংক্রান্ত চুক্তির ধারা বাতিল করতে হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশ কেবল সাংবিধানিকভাবে নিজ জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, বরং আমরা বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সুন্দরবনের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা না করে প্রণীত প্রাথমিক পরিবেশগত প্রতিবেদন এবং প্রদত্ত অবস্থানগত ছাড়পত্র বাতিল, অবিলম্বে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, ভূমিগ্রাস বন্ধ এবং পরিবেশগত প্রভাব ও জনমত যাচাই সাপেক্ষে অন্যকোন সুবিধাজনক স্থানকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দাবী জানাচ্ছি।

Ramsar Site[1]



[1] The Ramsar Convention is an intergovernmental, and the only global environmental treaty, which covers all geographic regions of the planet that provides the framework for national action and international cooperation for the conservation and wise use of wetlands and their resources. The treaty was adopted in the Iranian city of Ramsar in 1971, and came into force in 1975.